আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জিয়া, তালপট্টি এবং অমীমাংসিত ইতিহাস

আলী ওসমান শেফায়েত

জিয়া, তালপট্টি এবং অমীমাংসিত ইতিহাস

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কালপঞ্জিতে ১৯৮১ সালের মে মাস শুধু ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়, বরং এটি সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয়তাবাদী একজন নেতার ট্র্যাজিক মৃত্যুকে স্মরণ করার মাস। এ মাসেই বাংলাদেশ তার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ককে হারিয়েছে। একই সঙ্গে হারিয়েছে তার সমুদ্রসীমার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘দক্ষিণ তালপট্টি’ দ্বীপের ওপর নিয়ন্ত্রণ। চার দশক পর সেই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ইতিহাসকে নতুন করে ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন। প্রশ্ন জাগে-প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদত কি শুধুই কিছু উচ্চাভিলাষী সেনাসদস্যের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ তালপট্টির জলসীমা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নীলনকশা?

বিজ্ঞাপন

১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকচিরে জেগে ওঠে প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটারের এক চিলতে ভূখণ্ড। বাংলাদেশ একে ‘দক্ষিণ তালপট্টি’ আর ভারত একে ‘নিউ মুর’ দ্বীপ হিসেবে নামকরণ করে। আপাতদৃষ্টিতে এটি শুধু একটি বালুচর মনে হলেও এর ভূকৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। আশির দশকের শুরুর দিকে ভূ-তাত্ত্বিক জরিপগুলোয় আভাস পাওয়া যায়, এই দ্বীপ ও এর সংলগ্ন সমুদ্রতলদেশে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোকার্বন বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তালপট্টি হাতছাড়া হওয়া মানে শুধু একটি দ্বীপ হারানো নয়, বরং বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমার ওপর বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার চিরতরে হারানো। এই দ্বীপটি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ‘লিটমাস টেস্ট’। জিয়াউর রহমান এই ইস্যুতে এক চুলও ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। বাংলাদেশের এক ইঞ্চি মাটি নিয়েও আপস করতে রাজি ছিলেন না।

গানবোট ডিপ্লোম্যাসি ও জিয়ার প্রতিরোধ

১৯৮১ সালের মে মাসে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে ভারত দ্বীপে বিএসএফ মোতায়েন করে এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস স্যানডায়াক’ পাঠিয়ে দ্বীপটি দখলের চেষ্টা চালায়। দিল্লির এই ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ বা শক্তির প্রদর্শন ছিল একটি নবীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।

সাধারণত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো এমন পরিস্থিতিতে বড় শক্তির কাছে নতজানু হয়, কিন্তু জিয়াউর রহমান ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তিনি ভারতের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। তিনি শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কড়া প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং বাংলাদেশের নৌবাহিনীর গানবোট ‘পাবনা’ ও ‘নোয়াখালী’কে সাহসের সঙ্গে ওই দ্বীপে পাঠিয়ে সরাসরি ভারতীয় নৌবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম এবং অত্যন্ত সাহসী সামরিক প্রতিরোধ। জিয়ার এই অনমনীয় ভঙ্গি বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ ছোট দেশ হতে পারে, কিন্তু নিজের সীমানা রক্ষায় সে কারো রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না।

রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে ভারত শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের কঠোর মনোভাব দেখে ভারত দক্ষিণ তালপট্টি থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে দ্বীপটিকে ‘নো ম্যান’স ল্যান্ড’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এটি ছিল সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এক বিশাল কূটনৈতিক ও সামরিক বিজয়।

জিয়ার এই সাহসী পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব জাতীয়তাবাদী জাগরণ সৃষ্টি হয়। ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে টেকনাফের সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সার্বভৌমত্ব রক্ষার মিছিলে শামিল হয়। জিয়ার এই ‘আপসহীন’ অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের ইমেজকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। পশ্চিমা বিশ্ব, চীন এবং মুসলিম দেশগুলো অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে যে, একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র কীভাবে তার চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সামরিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকারের কথা বলছে।

ঠিক এই সময়েই জিয়াউর রহমান ‘সার্ক’ গঠনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি আঞ্চলিক জোট, যেখানে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো আধিপত্যবাদের শিকার না হয়ে নিজেদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। তার এই দূরদর্শী পরিকল্পনা অনেক আঞ্চলিক শক্তির জন্য ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি যখন উপগ্রহের চিত্র পেশ করে তালপট্টির দাবি জোরালো করছিলেন, তখন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে তিনি এক বড় ‘থ্রেট’ হিসেবে আবির্ভূত হন।

ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় ও বেদনার দিকটি হলো-১৯৮১ সালের মে মাসের সেই ঘটনাক্রম বা টাইমলাইন। যখন দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার স্নায়ুযুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে, যখন জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করছে ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে এক রহস্যজনক ও বিতর্কিত সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন জিয়াউর রহমান।

জিয়ার এই হত্যাকাণ্ড কি শুধুই সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ছিল? বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করে, এর পেছনে গভীর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ছিল। একজন রাষ্ট্রনায়ক যখন আঞ্চলিক আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এবং নিজের দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেন, তখন তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অনেক অপশক্তির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। মে মাসের মাঝামাঝি তালপট্টি নিয়ে সংঘাত শুরু হওয়া এবং মে মাসের শেষে জিয়ার মৃত্যু-এ দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না-তা চার দশক পরও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতা ও অস্থিরতা তৈরি হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে তালপট্টি ইস্যুতে। জিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই যেন তালপট্টির ওপর বাংলাদেশের জোরালো দাবিরও অপমৃত্যু ঘটে। পরবর্তী সরকারগুলো সেই আগের মতো হার্ডলাইন ডিপ্লোম্যাসি বা আপসহীন অবস্থান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।

বিশেষ করে, ১৯৮৪ সালে অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের রহস্যজনক মৃত্যু এই পুরো প্রক্রিয়াকে আরও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে তোলে। দেশের সেরা দুই সন্তান, যারা সমুদ্রসীমা রক্ষায় সম্মুখভাগে ছিলেন, তাদের রহস্যজনক বিদায় বাংলাদেশের সমুদ্র-স্বার্থকে পঙ্গু করে দেয়। পরবর্তী দশকগুলোতে তালপট্টি ইস্যুটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। ভারত সেই সুযোগে দ্বীপে তাদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার কৌশল নেয়।

তিন দশক পর ২০১৪ সালে স্থায়ী সালিশি আদালতের (PCA) রায়ে যখন সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি হয়, তখন কারিগরি ও আইনি মারপ্যাঁচে দ্বীপটি ভারতের ভাগে পড়ে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দ্বীপটি বর্তমানে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়, কিন্তু এর প্রতীকী ও রাজনৈতিক গুরুত্ব আজও আছে। অনেক সমুদ্র বিশেষজ্ঞ, যেমন অধ্যাপক ড. আব্দুর রব মনে করেন, তালপট্টি দ্বীপের অস্তিত্ব এখনো আছে এবং ভাটার সময় তা জেগে ওঠে। ভারতের পক্ষ থেকে দ্বীপটি ‘তলিয়ে গেছে’ বলে যে প্রচারণা চালানো হয়, তার পেছনে কৌশলগত কারণ থাকতে পারে। কারণ বাংলাদেশ এই দ্বীপের মালিকানা লাভ করলে সমুদ্রসীমা আরো অনেক দূর এগিয়ে যেত।

জিয়াউর রহমান এবং দক্ষিণ তালপট্টি এ দুটি বিষয় আজ আর শুধু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের অংশ। জিয়া শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বিশ্বমঞ্চে নিজের অধিকারের কথা বলতে হয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একটি ক্ষুদ্ররাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু তার সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে একজন দূরদর্শী, সাহসী ও জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের ওপর।

আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জিয়ার সেই সাহসী অবস্থানের মূল্যায়ন করা জরুরি। কারণ, একটি জাতির টিকে থাকা নির্ভর করে তার নেতার সাহসিকতা এবং জনগণের ঐক্যের ওপর। দক্ষিণ তালপট্টি আমাদের হাতছাড়া হয়েছে সত্য, কিন্তু সেই লড়াইয়ের চেতনা আজও বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। জিয়ার হত্যাকাণ্ড আমাদের এই সতর্কবার্তা দেয় যে, যখন কোনো জাতিরাষ্ট্র তার ন্যায্য অধিকার আদায়ে বড় শক্তির মুখোমুখি হয়, তখন অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের পথ ধরে বিদেশি স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা চলে।

১৯৮১ সালের মে মাস বাংলাদেশের ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়ের অংশ। একদিকে বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা ‘দক্ষিণ তালপট্টি’ দ্বীপ নিয়ে বীরত্বগাথা, অন্যদিকে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনা দুটি একই সুতোয় গাঁথা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। জিয়ার রক্তে রঞ্জিত চট্টগ্রামের মাটি এবং তালপট্টির বালুচর আজ আমাদের এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

জিয়াউর রহমানের শাহাদতের ৪৪ বছর পর আজ সময় এসেছে সেই ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরার। যে জাতি তার সার্বভৌমত্বের রক্ষককে চিনতে ভুল করে, সেই জাতির মানচিত্রের নিরাপত্তা চিরকালই হুমকির মুখে থাকে। জিয়াউর রহমান নেই, দক্ষিণ তালপট্টিও হয়তো আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তাদের সেই মিলিত ইতিহাস আজও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের আকাশে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা, যা আমাদের শিখিয়ে যায় : ‘সীমানা রক্ষায় আপস মানেই অস্তিত্বের বিলোপ।’

লেখক : কলামিস্ট ও লেখক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন