বাংলাদেশে ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে রাজনীতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চিন্তা ও কর্মে নতুনত্ব প্রকাশ পায়। ক্রমে তা বিকশিত হয় এবং উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ানের বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভাবনা ও ধারণা বিস্তৃত হয়, শক্তি সঞ্চয় করে। এ সময় যারা কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন আখতার-উল-আলম তাদের একজন।
পেশাদার সাংবাদিক আখতার-উল-আলম ‘পেশায় সিনিয়র’ হওয়ার একপর্যায়ে সহকারী সম্পাদক হিসেবে ‘নিয়মিত কলাম’ লেখার ‘দায়’ গ্রহণ করেন। সে সময়টিতে ‘স্বনামে’ কলাম না লেখার একটি অলিখিত চর্চা চালু হয়। আখতার-উল-আলমও এ ধারায় চলেছেন। ‘স্থান-কাল-পাত্র’ শিরোনামে ‘লুব্ধক’ নামে উপসম্পাদকীয় লিখে চলেন এবং লুব্ধক নামে খ্যাতিমান হন। দৈনিক ইত্তেফাকের সেই ‘ভরা যৌবনের দিনগুলোয়’ লুব্ধকের সাপ্তাহিক কলাম পড়ার জন্য বহু পাঠক মুখিয়ে থাকতেন।
আখতার-উল-আলম ১৯৩৯ সালের ২২ জুন রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়নের তাজনগর গ্রামের খ্যাতিমান শাহ-ফকির পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ২০১০ সালের ২৪ জুন ৭১ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
আখতার-উল-আলমের শিক্ষাজীবনের সূচনা স্থানীয় বলদিপুকুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে রাণীপুকুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। রংপুর কারমাইকেল কলেজ এবং সরকারি ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক পরিসরে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা ও অনাড়ম্বর।
শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবনের পুরো সময়জুড়েই সংবাদপত্রে লেখালেখির পাশাপাশি তিনি গল্প, কবিতা ও উপন্যাস রচনায়ও নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ষাটের দশকের শুরুতে তৎকালীন মুসলিম বাংলার অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক আজাদ-এর মাধ্যমে তার সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা হয়। তিনি আজাদ গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে মুসলিম বাংলার বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিক মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর তত্ত্বাবধানে দৈনিক আজাদ-এর সম্পাদকীয় ও কলাম লেখার দায়িত্বও পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ এবং তার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি দেওয়া ব্যক্তিত্ব মুজিবুর রহমান খাঁর আহ্বানে তিনি অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গাম-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। তবে নীতি ও আদর্শগত কারণে পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিলে তিনি পয়গাম ত্যাগ করে আবার দৈনিক আজাদ-এ ফিরে আসেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অভিযানের সময় তাকে পত্রিকা অফিস থেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আটক রাখা হয়। সৌভাগ্যক্রমে কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি মুক্তি পান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিক ইত্তেফাক-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই দৈনিক ইত্তেফাক-এর জনপ্রিয় ‘স্থান-কাল-পাত্র’ কলামে ‘লুব্ধক’ ছদ্মনামে তার লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে। পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে কলামটি। সত্তর ও আশির দশকজুড়ে ‘স্থান-কাল-পাত্র’ ছিল দেশের অন্যতম জনপ্রিয় কলাম। ১৯৮৫ সালে তিনি সহকারী সম্পাদক থেকে দৈনিক ইত্তেফাক-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। তার সময়েই ইত্তেফাক দেশের সর্বাধিক প্রচারিত ও প্রভাবশালী দৈনিকগুলোর অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আখতার-উল-আলমের কাছে সাংবাদিকতা ছিল শুধু পেশা নয়, এক ধরনের নেশা। আদর্শগতভাবে তিনি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও প্রগতিশীল ইসলামি চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। তার লেখায় ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, দর্শন ও রাজনৈতিক ভাবনা এমনভাবে উঠে আসত যে, দেশের বামঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ তাকে কখনো ‘গোঁড়া’, কখনো ‘জামায়াতি’ বলে আখ্যায়িত করতেন। তবে বাস্তবে তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত একজন লেখক ও সাংবাদিক।
খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলে তিনি রাষ্ট্রদ্বূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাংবাদিকতা থেকে এই সাময়িক বিরতি নিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চার বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি আবার সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন এবং দৈনিক দিনকাল-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর দৈনিক ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষ তাকে আবার যোগদানের আহ্বান জানালে তিনি উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে নিজের দীর্ঘদিনের কর্মস্থলে ফিরে আসেন। আবার শুরু হয় তার বহুল জনপ্রিয় ‘স্থান-কাল-পাত্র’ কলাম।
সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে নানা সম্মাননা ও স্বীকৃতি লাভ করেন। ১৯৮২ সালে সাংবাদিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের অনারারি সিটিজেনশিপ অর্জন করেন। ২০০০ সালে সৌদি আরবের সরকারি পত্রিকা সাউদি গেজেট তাকে বিশ্বের ‘ফাইভ লিডিং মুসলিম জার্নালিস্ট’-এর একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তার সাহিত্যজীবনও ছিল সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক। মৌলিক রচনার পাশাপাশি তিনি একজন কৃতিত্বপূর্ণ অনুবাদক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। তার অনূদিত ফরাসি চিন্তাবিদ মরিস বুকাইলির ‘বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থটি প্রকাশনার জগতে ব্যাপক আলোড়ন তোলে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অন্যতম সর্বাধিক বিক্রীত বই হিসেবে পরিচিতি পায়।
আখতার-উল-আলমের মৌলিক ও অনূদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৫। তার উল্লেখযোগ্য মৌলিক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুসলিম জাহান ও পাশ্চাত্য জগৎ, শেষ নবী (সা.), ইবনে খালদুন, মূল্যবোধের জন্য, সাহিত্য প্রসঙ্গ, জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত এবং আসমানে চাঁদ দেয় আজান। তার গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান, মানুষের ধর্ম, মধ্যযুগের মুসলিম ভারত, একটি শহরের উপকথা, পল হরগানের গল্প, সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতি: একটি সমীক্ষা, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, লেনিন ও স্ট্যালিন, কেনেডি এবং প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও বাইবেল বিশারদ আহমেদ দিদাতের দি চয়েস। আখতার-উল-আলম বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং বিশেষভাবে সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় এখনো ‘প্রাসঙ্গিক’ হয়ে আছেন এবং দীর্ঘদিন তিনি প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তার মৌলিক রচনা-প্রকাশনা এবং তাৎপর্যপূর্ণ অনুবাদকর্মের সূত্রে তিনি যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক : প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

