স্কুলে বিকালে ক্লাস নয়, খেলাধুলার সুযোগ দিন

মাহবুবুর-রাজ্জাক
ড. মাহবুবুর রাজ্জাক

স্কুলে বিকালে ক্লাস নয়, খেলাধুলার সুযোগ দিন
জেমিনি দিয়ে ছবি তৈরি

জুন-জুলাই মাস প্রচণ্ড গরমের মাস। দিনে তো গরম থাকেই। রাতেও প্রচণ্ড গরম। আম-কাঁঠাল পাকানো গরম। এই গরমে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন। ব্রিটিশ আমলে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এটি ভালোভাবে বুঝেছিলেন। শুনেছি তিনি উপরমহলে দেনদরবার করে বাংলার ছাত্রদের জন্য বছরের এই সময়টিতে গ্রীষ্মের ছুটির ব্যবস্থা করেছিলেন। এই গ্রীষ্মের ছুটি ছিল বছরের সবচেয়ে আনন্দময় ছুটিগুলোর একটি। এ সময় স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকত, তাই শিক্ষার্থীরা বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারত। অনেকেই গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যেত, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হতো এবং গ্রামীণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারত। আম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা মৌসুমি ফল খাওয়ার সুযোগ হতো।

এখন সময় বদলে গেছে। গ্রীষ্মের ছুটি বলে কিছু নেই। জুনের মাঝামাঝি সময়ে কুমিল্লার গ্রামে একটি মাধ্যমিক স্কুলে গিয়েছিলাম। ভালো পড়াশোনা হয় বলে স্কুলটির নামডাক আছে। এর ক্লাসরুমগুলো সিসি ক্যামেরা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের অফিস থেকে নজরদারি করা যায়। অফিসে বসেই লক্ষ করলাম সকালে ছাত্রদের উপস্থিতি মোটামুটি ভালো ছিল। কিন্তু লাঞ্চের বিরতির পর উপস্থিতি বেশ কমে গেল। বলা হলো, প্রচণ্ড গরমে বাসায় গিয়ে খেয়েদেয়ে অনেকে পরিশ্রান্ত হয়ে যায়, কড়া রোদ মাড়িয়ে স্কুলে ফিরে আসার উৎসাহ থাকে না। স্কুলের শিক্ষকদের কাছে জানতে চাইলাম, ক্লাস সকালে কেন করা হয় না। সকাল ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত ক্লাস করলে তো লাঞ্চের জন্য বিরতি দিতে হয় না। তারা বললেন, বাধ্যতামূলক সরকারি নির্দেশ—মাধ্যমিক স্কুলে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ক্লাস করতে হবে—হোক সেটি শীতের দিন কিংবা গরমের দিন।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বললাম। তিনিও এ কথাই জানালেন। তবে তিনি স্বীকার করলেন গরমকালে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত স্কুল করা ছাত্রদের জন্য অসুবিধাজনক। সকাল ৮টা থেকে স্কুল শুরু করতে পারলে ছাত্র-শিক্ষক সবার জন্যই আরামদায়ক হতো। কিন্তু সরকারি নির্দেশনার কারণে সেটি করা সম্ভব নয়। গ্রীষ্মকালে যখন অতিরিক্ত গরমের কারণে সবাইকে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হয় এবং রোদে বের হলে সতর্কভাবে চলাচল করতে হয়, তখন ছোট ছাত্রদের স্কুলে আসার সময় ও লাঞ্চের বিরতিতে কয়েকবার কড়া রোদে চলাচল করতে বাধ্য করার কী কারণ থাকতে পারে, তা মোটেই বোধগম্য নয়। মাঝেমধ্যেই প্রচণ্ড গরমে একসঙ্গে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে, পানিশূন্যতার শিকার হয়। কখনো কখনো হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।

১০টা-৫টা স্কুল তো কর্মজীবী মানুষের অফিস সময়ের মতো। ছাত্রদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কার্যক্রম করার সময় তাতে থাকে না। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত স্কুল করে বাড়ি ফেরার পর মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করার মতো শক্তি ও সময় থাকার কথা নয়। এতে বড় একটি জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে মোবাইল, কম্পিউটার ও বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই জনগোষ্ঠী শারীরিকভাবে দুর্বল ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে গড়ে উঠছে। একটি সুস্থ-সবল জাতি গঠন করতে চাইলে বিকালের সময়টি ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল কাজকর্ম চর্চা ও খেলাধুলায় আত্মনিয়োগের জন্য ছেড়ে দিতে হবে।

শুধু তাই নয়। প্রতিটি স্কুলে শিক্ষার অংশ হিসেবে বাধ্যতামূলক খেলাধুলার নিয়ম চালু করতে হবে। এজন্য স্কুলগুলোয় পর্যায়ক্রমে খেলাধুলার মাঠসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। অবকাঠামোগত সুযোগ অনুযায়ী প্রতিটি স্কুলে দু-একটি খেলা বাধ্যতামূলক কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। যেমন : সঠিক মাপের মাঠ থাকলে ফুটবল, হকি, ক্রিকেট; পুকুর থাকলে সাঁতার; ইনডোর-আউটডোর কোর্ট থাকলে ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি ইত্যাদি। ফুটবল বা ক্রিকেট মাঠ প্রতিটি স্কুলে সম্ভব না হলেও প্রতি ইউনিয়নে যাতে একটি করে হয়, তার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকার গুচ্ছগ্রাম তৈরির জমি বের করতে পারলে খেলার মাঠের জমিও নিশ্চয়ই বের করতে পারবে। এই কাজ যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়, ততই ভালো। দেরি করলে পরে জমি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

স্কুল-কলেজ আর লেখাপড়ার উদ্দেশ্য হলো একটি প্রাণচঞ্চল কর্মক্ষম জাতি গঠন। তবে শুধু লেখাপড়ায় বিনিয়োগ করেই কর্মক্ষম জাতি গঠনের আশা করা ঠিক হবে না। সুস্থ-সবল মানুষ তৈরির জন্য খেলাধুলায়ও অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করতে হবে। আশার কথা, সরকারও সম্প্রতি বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। সরকারের উচিত হবে জেলাপর্যায়ে স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চালু করে মেধাবী খেলোয়াড়দের তৃণমূল থেকে আঞ্চলিক স্তর হয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছার পথ তৈরি করে দেওয়া। সঙ্গে সঙ্গে ক্রীড়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্কুলপর্যায়ে ক্রীড়া কার্যক্রম তদারকি করার ব্যবস্থা করা। খেলাধুলার কার্যক্রম জোরদার করতে হলে স্কুলের একাডেমিক কার্যক্রম অবশ্যই লাঞ্চের আগে শেষ করতে হবে। তাছাড়া সকালের ঠান্ডা হাওয়া পড়াশোনার জন্য সহায়ক। সকাল ৮টায় স্কুলের ক্লাস শুরু হলে রাস্তায় যানবাহনের চাপও কম হবে।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...