গত ১৩ মে অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে সরকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। প্রকল্পটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রায় ৩৭ ভাগ এলাকার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এবং পুরো দেশ পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। তাই যেকোনো মূল্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেই হবে।
এক নজরে পদ্মা ব্যারাজ : পদ্মা ব্যারাজ হচ্ছে পদ্মা নদীতে নির্মিতব্য একটি বাঁধ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে । ২০২৬ সালের জুলাই থেকে কাজ শুরু হবে এবং ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটির নির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজটি নির্মাণ করা হবে। প্রস্তাবিত ব্যারাজের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ১ কিলোমিটার, এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট এবং ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট থাকবে। ব্যারাজটি নির্মাণে ১৮০ কিলোমিটার এফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ এবং ১৩৬ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং ও পুনঃখনন করা হবে। দুটি ফিস পাসও রাখা হবে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দেশের ৪ বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩টি উপজেলায় বিস্তৃত, যা দেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ। প্রকল্পটির প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল এবং খুলনা বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে । ১৯টি জেলা হচ্ছে—কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোহর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুর। এতে দেশের সাত কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে ।
পদ্মা ব্যারেজের দীর্ঘ পথপরিক্রমা : পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৬০ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণকাজ হাতে নেয়। পরপরই পাকিস্তান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়টি চিন্তা করে । তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (WAPDA) ১৯৬১ সালে এর প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে । ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করে এবং বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানি থেকে বঞ্চিত করা শুরু করে। ফলে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৪০ বছরে ব্যারাজটির সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয় । ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টিম ২০০৫ সালে এর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করে, যা ২০১৩ সালে শেষ হয় । পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকল্পটি চাপা পড়ে যায় ।
পদ্মা ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা : ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা নামক স্থানে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে। এটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ভারতের ১৮ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত। ২৩০৪ মিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধটির নির্মাণ ১৯৬১ সালে শুরু এবং ১৯৭৫ সালে শেষ হয়। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল এটি চালু হয়। গঙ্গা নদীটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা হয়ে পদ্মা নামে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসারে ভারত কিছুতেই এই নদীতে বাঁধ দিয়ে ইচ্ছামতো পানিপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না । কিন্তু ভারত শক্তির জোরে অভিন্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানি থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। ভারত শুকনো মৌসুমে গঙ্গা নদীর পানি আটকে রাখে, ফলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পানি থেকে বঞ্চিত হয়। বর্ষা মৌসুমে ভারত অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ছেড়ে দেয়। এতে বাংলাদেশে বন্যার সৃষ্টি হয়। শুকনো মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৮-১০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যায়, মাটির আর্দ্রতা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। পানি কমে যাওয়ায় কুষ্টিয়ার বেড়ামারায় অবস্থিত গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নদীতে মাছের সরবরাহ কমে যায়। ফলে অনেক জেলে বেকার হয়ে পড়েন। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নৌপরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে বাংলাদেশ বরাবরই আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং ভারত কর্তৃক সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় গঙ্গা নদীর বাংলাদেশ অংশে—অর্থাৎ পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশে বাঁধ নির্মাণ ভারতের পানি আগ্রাসনের একমাত্র যৌক্তিক এবং টেকসই সমাধান। বর্ষার পানি প্রয়োজনমতো আটকে রেখে তা শুকনো মৌসুমে চাহিদা অনুসারে ব্যবহারই ব্যারাজটির প্রধান কাজ। সুতরাং পদ্মা ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য এবং অনস্বীকার্য ।
পদ্মা ব্যারাজের উপকারিতা : পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে, তা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে । প্রথমত ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুকনো মৌসুমে সৃষ্ট পানির সংকট থেকে মুক্তি মিলবে। ব্যারাজটি নির্মিত হলে পদ্মা নদীতে প্রায় ২৯০ কোটি কিউবিক মিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে। এই পানি দিয়ে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী পুনরুজ্জীবিত করা হবে। ফলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোহর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা এবং রাজশাহী অঞ্চলের ২৯ লাখ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। এতে প্রতিবছর প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পটিতে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যা দেশের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিরাটসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে, পরিকল্পিতভাবে ভূমির উন্নয়ন হবে এবং নতুন শহর গড়ে উঠবে। দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষি, মৎস্য, বনজসম্পদ, নৌপরিবহন, খাবার পানির প্রাপ্যতা এবং পরিবেশের ব্যাপক উন্নতি ঘটবে। পানির লবণাক্ততা কমবে। এলাকাটি পর্যটন এলাকা হিসেবে ও গড়ে উঠবে।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে অর্থায়ন : পুরো প্রকল্পটির জন্য ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়ায় প্রথম ধাপের জন্য ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। পুরো অর্থই সরকারি তহবিল থেকেই ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপের প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সাত বছরে খরচ হবে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেই হবে : ভারত অভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করায় বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়েও ভারত চুক্তি করেনি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারত এবং বাংলাদেশ ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি করলেও, ভারত কখনোই চুক্তি অনুযায়ী শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি দেয়নি। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার পানি বণ্টন সমস্যা সমাধানে যৌথ নদী কমিশন থাকলেও তা অনেকটাই অকার্যকর এবং এই কমিশন ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশকে ন্যায্য পানি এনে দিতে পারেনি। ভারত যেহেতু বাংলাদেশকে ন্যায্য পানি দিচ্ছে না, সেহেতু এ সমস্যা সমাধানে ভারতের দেওয়া বাঁধের বিপরীতে বাংলাদেশ অংশে অনুরূপ বাঁধ নির্মাণই ভারতের পানি আগ্রাসনের উপযুক্ত সমাধান।
লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক
ই-মেইল : omar_ctg123@yahoo.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

