নিউ জার্সির নীল আকাশে কার গর্জন

ব্রাজিলের শৈল্পিক সাম্বা, নাকি নরওয়ের রুদ্র তাণ্ডব

নজরুল ইসলাম

ব্রাজিলের শৈল্পিক সাম্বা, নাকি নরওয়ের রুদ্র তাণ্ডব

একদিকে কার্লো আনচেলত্তির অধীনে হেক্সা মিশনের খোঁজে থাকা সেলেসাওরা, অন্যদিকে আর্লিং হ্যালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের ছোঁয়ায় খোলনলচে বদলে যাওয়া ‘রিটার্নিং ভাইকিংস’। ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে আবারও এসেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে। নিউ জার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দুদল মাঠ নামবে আজ রোববার রাত ২টায়। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে নামবে তারা। লড়াইটা ভিনিসিয়ুসদের শৈল্পিক সাম্বা বনাম আর্লিং হাল্যান্ডের রুদ্র তাণ্ডবের।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে একটি অদ্ভুত রেকর্ড রয়েছে—তারা আন্তর্জাতিক ফুটবলে কখনই নরওয়েকে হারাতে পারেনি। এর আগে চারবারের দেখায় দুটিতে ড্র এবং দুটিতে হেরেছে সেলেসাওরা। সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল ম্যাচটি হয়েছিল আজ থেকে ঠিক ২৮ বছর আগে, ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। সেবার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ২-১ ব্যবধানে নরওয়ের কাছে হেরেছিল ব্রাজিল। যদিও সেই হারের পরও ব্রাজিল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই নকআউটে গিয়েছিল। এরপর ২০০৬ সালের এক প্রীতি ম্যাচে দল দুটির সাক্ষাৎ ১-১ গোলে অমীমাংসিত থেকে গিয়েছিল। ২০২৬ সালে এসেও সেই অধরা জয়ের খোঁজে নামবে দক্ষিণ আমেরিকার এই ফুটবল পরাশক্তি। বিশেষ করে ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে নকআউট পর্বে ব্রাজিলের রেকর্ড মোটেও সুবিধার নয়, যা আনচেলত্তির দলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে নিশ্চিত।
চলতি বিশ্বকাপে ফিফা র‌্যাংকিংয়ের পঞ্চম সেরা ব্রাজিলের পথচলা খুব একটা মসৃণ ছিল না। শেষ ষোলোর টিকিট কাটতে জাপানের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ২-১ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় পেতে হয়েছে তাদের। ম্যাচের ২৯ মিনিটে কাইশু সানোর গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে তরুণ তুর্কি এনড্রিককে মাঠে নামিয়ে আক্রমণাত্মক ৪-২-৪ ফরমেশনে জুয়া খেলেন ইতালীয় কোচ আনচেলত্তি। ক্যাসেমিরোর সমতাসূচক গোলের পর ম্যাচের যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির গোলে রক্ষা পায় ব্রাজিল। তবে র‌্যাংকিংয়ের ২১তম নরওয়ের মতো শক্তিশালী কাউন্টার অ্যাটাকিং দলের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অল আউট আক্রমণে যাওয়ার মতো ভুল আনচেলত্তি করবেন না বলেই ধারণা ফুটবল বিশ্লেষকদের। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রাজিল সম্ভবত তাদের চেনা ৪-৩-৩ ফর্মেশনেই ফিরবে।
ম্যাচের আগে ব্রাজিলের মূল দুশ্চিন্তা খেলোয়াড়দের ফিটনেস নিয়ে। রাফিনহা ইতোমধ্যেই দল থেকে ছিটকে গেছেন। অন্যদিকে জাপানের বিপক্ষে প্রথমার্ধেই তুলে নেওয়া লুকাস পাকেতা এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্তে চোট পাওয়া ক্যাসেমিরোর ফিটনেস নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। ক্যাসেমিরো মাঠে নামতে পারবেন বলে আশা করা হলেও পাকেতার জায়গায় মাঝমাঠে দানিলো সান্তোসের খেলার সম্ভাবনা বেশি। আক্রমণভাগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফরোয়ার্ড ম্যাথিউস কুনিয়া নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেন, যার ফলে জাপানের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোল করা মার্টিনেল্লি আবারও বেঞ্চে বসেই শুরু করতে পারেন। বদলি হিসেবে মাঠে নামতে পারেন নেইমার জুনিয়রও। তবে এটা নির্ভর করছে ম্যাচের পরিস্থিতি ও কোচের কৌশলের ওপর। ব্রাজিলের মূল ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, যিনি চলতি বিশ্বকাপে চারটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট নিয়ে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন।
অন্যদিকে আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করা নরওয়ে এই ম্যাচে নামবে কোনো ইনজুরি ছাড়াই। ইনজুরি কাটিয়ে ফিরতে পারেন ডিফেন্ডার জুলিয়ান রাইয়ারসনও। নরওয়ের প্রধান অস্ত্র ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হ্যালান্ড, যিনি নিজের অভিষেক বিশ্বকাপেই পাঁচ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির ঠিক পেছনেই আছেন। নরওয়ের করা ১০ গোলের ৫০ শতাংশই এসেছে হ্যালান্ডের পা থেকে। আর তাকে বল জোগান দেওয়ার মূল কারিগর অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড তিনটি অ্যাসিস্ট) এবং প্যাট্রিক বার্গ (দুটি অ্যাসিস্ট)। তবে নরওয়ের মূল সমস্যা তাদের রক্ষণভাগ। চলতি বিশ্বকাপে খেলা প্রতিটি ম্যাচেই তারা যেমন গোল করেছে, তেমনি গোল হজমও করেছে। ফরাসিদের বিপক্ষে দ্বিতীয় সারির দল নামিয়ে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়া ছাড়া বাকি সব ম্যাচেই অবশ্য জয় পেয়েছে স্টেল সোলবাকেনের দল।
কাগজে-কলমে ব্রাজিল ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামলেও মাঠের লড়াই হবে সমানে সমান। ফুটবলপ্রেমীদের মূল নজর থাকবে আর্লিং হ্যালান্ড বনাম গ্যাব্রিয়েল মাগাহায়েসের দ্বৈরথের দিকে। তবে ব্রাজিলের জন্য ভয়ের কারণ হতে পারে যদি হ্যালান্ড বারবার মারকুইনহোসকে টার্গেট করেন। কারণ, শারীরিকভাবে শক্তিশালী স্ট্রাইকারদের বিরুদ্ধে মারকুইনহোসের কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে।
নরওয়ের গতিময় কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবল ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে। যদি ওডেগার্ড মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হ্যালান্ডকে দ্রুত পাস সরবরাহ করতে পারেন, তবে ব্রাজিলের ‘নরওয়ে জুজু’ অক্ষুণ্ণ রেখে ভাইকিংসরা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এখন একটাই দেখার নিউ জার্সির নীল আকাশ কার গর্জনে প্রকম্প হয়।


মুখোমুখি লড়াই ৪
ব্রাজিলের জয় ০
নরওয়ের জয় ২
ড্র ২

র‌্যাংকিংয়ে অবস্থান
ব্রাজিল ৫
নরওয়ে ২১

বিজ্ঞাপন
Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...