আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে বাড়ি ফিরে বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী কিছুটা অবাকই হলেন। তিনি দেখলেন, তার লাগেজের ভেতর একটি পিস্তল এবং তাজা গুলি রয়েছে।
গত বুধবার আঙ্কারায় ন্যাটোর এক উত্তেজনাপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন শেষে আয়োজক দেশ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বিশ্বনেতাদের এক ব্যতিক্রমী বিদায়ী উপহার দেন। তিনি প্রত্যেকের হাতে একটি করে পুরনো আমলের রিভলভার এবং তাজা গুলি তুলে দেন। উপহারটি যে কেবল প্রদর্শনের জন্য নয়, তাজা গুলি দিয়ে তা স্পষ্ট করা হয়েছে।
মূলত তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতেই এরদোয়ান এই উদ্যোগ নেন। বর্তমানে দেশটির অস্ত্র খাত বড় একটি রপ্তানি পণ্য এবং পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট গিতানাস নাউসেদার কার্যালয় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, কাঠের বাক্সে তুরস্কের জাতীয় পতাকা ও ন্যাটোর লোগো সংবলিত একটি গুমুসাই শূন্য দশমিক ৩৫৭ ম্যাগনাম রিভলভার রাখা হয়েছে। বাক্সে থাকা তথ্যফলকে এটিকে ‘তুরস্কে উৎপাদিত প্রথম রিভলভারধর্মী হ্যান্ডগান’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের একজন মুখপাত্র জানান, সব নেতাকেই একই ধরনের রিভলভার দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটিতে সংশ্লিষ্ট নেতার নাম খোদাই করা ছিল।
শোনা যাচ্ছে, বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ভেভার দেশে ফিরে নিজের লাগেজে রিভলভার ও গুলি দেখতে পান। পরে তিনি সেটি ব্রাসেলস বিমানবন্দর পুলিশের কাছে নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য জমা দেন।
পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কির এক সহকারী জানান, তার রিভলভারটি ওয়ারশ বিমানবন্দরে শুল্ক ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করার পরই এটি গ্রহণ করা হবে। তিনি মজা করে বলেন, নিশ্চয়ই কেউ এটি দিয়ে গুলি চালাবে না।
নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, তাদের রিভলভার দুটি আঙ্কারায় নিজ নিজ দূতাবাসে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডসের উপহারটি ব্যবহার অযোগ্য (ডিঅ্যাকটিভেট) করা হবে, আর সুইডেনেরটি আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের উপহারের সঙ্গে একটি পরিষ্কার করার কিট ও ৫০০ রাউন্ড গুলিও দেওয়া হয়েছিল। তবে অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি রিভলভারটি যুক্তরাজ্যে নিতে পারেননি এবং সেটি নিষ্ক্রিয় করার জন্য আঙ্কারাতেই রেখে গেছেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির রিভলভারটি ইতোমধ্যে সরকারি ভবন পালাজ্জো কিজিতে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় উপহারের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন তার রিভলভারটি একটি সামরিক জাদুঘরে দান করার পরিকল্পনা করছেন।
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিসও সেটি এথেন্সের যুদ্ধ জাদুঘরে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি রসাত্মক মন্তব্য করে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে ম্যাপেলসিরাপের তৈরি আমার উপহারটি তুর্কি উপহারের তুলনায় বেশ হালকা হয়ে গেছে।’
এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, তিনি নিজে পিস্তলটি দেখেননি। কানাডিয়ানদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘তারা অস্ত্র আমার থেকে দূরেই রাখে।’
পিস্তলটি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে এবং এটি জাতীয় যুদ্ধ জাদুঘরে স্থান পেতে পারে।
উপহারগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। কেউ কেউ এটিকে প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখলেও অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা বিষয়টিকে শুল্ক ও কূটনৈতিক প্রটোকলের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছেন।
বর্তমানে তুরস্কের আধুনিক হ্যান্ডগান শিল্প মূলত সেমি-অটোমেটিক অস্ত্রের ওপর জোর দেওয়ায় এই গুমুশায় রিভলভারটি সংগ্রাহকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। তুর্কি অস্ত্র নির্মাতারা কমদামী পিস্তল এবং শটগান নিয়ে ইউরোপের বেসামরিক অস্ত্রের বাজারে বেশ ভালো জায়গা করে নিয়েছে। তারা ইতালি এবং বেলজিয়ামের মতো পুরনো ও নামী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
জেনেভাভিত্তিক ‘স্মল আর্মস সার্ভে’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তুরস্ক ছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ক্ষুদ্রাস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। এই সময়ে তারা প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করেছে, যার সামনে রয়েছে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালি।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

