ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন। সোমবার (২২ জুন) মহাদেশটির বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা রেকর্ড মাত্রা ছাড়িয়েছে। তীব্র গরমে ফ্রান্সে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশুর মরদেহ একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ মাধ্যম রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলের বিখ্যাত ওয়াইন উৎপাদন এলাকা বোর্দোতে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা আগের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। মধ্যাঞ্চলের পোয়তিয়ে শহরেও তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে, ভেঙে যায় ১৯৪৭ সালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির কয়েকটি অঞ্চলে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে বা সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, চলমান তাপপ্রবাহে দেশটিতে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পুরোনো রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে। কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সে গাড়ির ভেতর দুই শিশুর মৃত্যু
দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কারপঁত্রা শহরে ২ ও ৪ বছর বয়সী দুই শিশুকে একটি পারিবারিক গাড়ির ভেতর অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। তাদের মা বাড়ির বাইরে গাড়িতে শিশু দুটিকে দেখতে পান। জরুরি সেবাকর্মীরা উদ্ধারের পর বাঁচানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যু হয়।
এ ছাড়া বোর্দো অঞ্চলে তীব্র গরমজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় সপ্তাহান্তে ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী তিনজন প্রবীণের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
ফ্রান্সের সিভিল সেফটি সার্ভিস জনগণকে সতর্ক করে জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের সময় পানিতে নামার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে এবং নিরাপদ স্থান ছাড়া সাঁতার না কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রোববার থেকে সোমবারের মধ্যে দেশটিতে পানিতে ডুবে ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
তাপপ্রবাহের কারণ ‘ওমেগা ব্লক’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের এই তীব্র তাপপ্রবাহের পেছনে রয়েছে ‘ওমেগা ব্লক’ নামের একটি আবহাওয়াগত ব্যবস্থা। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক ক্লেয়ার বার্নস জানান, গ্রিক অক্ষর ওমেগার আকৃতির মতো এই ব্যবস্থায় মাঝখানে গরম বায়ু আটকে থাকে এবং দুই পাশে ঠান্ডা বায়ুর অবস্থান তৈরি হয়।
এর ফলে উত্তর আফ্রিকার সাহারা অঞ্চল থেকে উষ্ণ বায়ু ইউরোপে প্রবেশ করছে। এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি ধীরে সরে যাওয়ায় শীতল বাতাসের প্রবাহ কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো আরও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি অতিবৃষ্টির প্রবণতাও বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যে প্রায় ৫০ বছরের রেকর্ড ভাঙার আশঙ্কা
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া সংস্থা মেট অফিস জানিয়েছে, চার দিনের এই তাপপ্রবাহে কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এমন হলে ১৯৫৭ ও ১৯৭৬ সালের জুন মাসের সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড ভেঙে যাবে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই যুক্তরাজ্যে মে মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছিল।
স্পেনেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। উত্তরাঞ্চলের তুলনামূলক শীতল শহর সান সেবাস্তিয়ানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক এলাকায় ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে।
ইতালির ১২ শহরে লাল সতর্কতা
তীব্র গরমের কারণে ইতালির ১২টি শহরে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ সামলাতে তুরিন শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যাও দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত কর্মী ও জেনারেটর প্রস্তুত রেখেছে।
তাপে বিপাকে পাখিরাও
অস্বাভাবিক গরমে মানুষের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণীও। বেলজিয়ামের একটি বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র জানিয়েছে, সুইফট, সোয়ালো, চড়ুই ও স্টারলিংসহ কয়েক প্রজাতির পাখি সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে।
ভবনের ছাদে তৈরি এসব পাখির বাসায় তাপমাত্রা ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে অনেক পাখি বাসার ভেতরে মারা যাওয়ার পরিবর্তে নিচে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে।
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


