নৈসর্গিক সৌন্দর্যে

হাওড়ের দিনলিপি

আফসানা খানম আশা

নৈসর্গিক সৌন্দর্যে

বর্ষায় হাওড় একটু বেশিই সুন্দর। ঢাকার আরামবাগ থেকে বাসে যাত্রা শুরু করে সুনামগঞ্জ পৌঁছালাম প্রায় সকাল ৯টায়। সেখান থেকে সিএনজিতে করে আরো এক ঘণ্টার যাত্রাপথ পাড়ি দিয়ে আনোয়ারপুর ঘাটে পৌঁছাই আমরা ১০ ভ্রমণসঙ্গী।

এখান থেকে ‘জল প্রসাদ’ হাউসবোটে শুরু হলো আমাদের হাওড়ের ওপর ভেসে বেড়ানোর যাত্রা। হাউসবোটের ছাদ যেন এক সুন্দর করে সাজানো বাগান। ছাদে বসে আড্ডা দিতে দিতে হাওড়ের রূপ উপভোগ করার সব আয়োজন আছে এই বোটে।

বিজ্ঞাপন

খোলা আকাশের নিচে নীল চাদরে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘের ভেলা, এই স্নিগ্ধ আলো-ছায়ার খেলা, সঙ্গে হিমেল হাওয়া, হাওড়ের অথই জলরাশিকে তৈরি করেছে এক জাদুকরী রূপে।

এই অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে সকালের নাশতা সেরে ফেললাম হাউসবোটের ছাদে। গরম ধোঁয়া ওঠা চা আর হাওড়ের রূপ সব মিলেমিশে যেন একাকার। হাওড়ের রূপে বিমোহিত হয়ে গলা ছেড়ে গান ধরার কেউ না থাকলেও অপার সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে আমরা ঘুরতে চলে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে।

টাঙ্গুয়ার হাওড় ট্রিপে জলকেলি করার সব থেকে দারুণ জায়গা এই ওয়াচ টাওয়ার। দল বেঁধে সবাই পানিতে নামল। ওয়াচ টাওয়ার ঘুরে ছুটলাম আবার টেকেরঘাটের পথে।

দিনের বিভিন্ন সময়ে আকাশ তার রূপ বদলায়; কখনো মেঘ-রোদের লুকোচুরি খেলা, আবার কখনো ঝকঝকে রোদ। তপ্ত দুপুরে টেকেরঘাট পৌঁছে হাউসবোটের লবিতে সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেলাম।

একটু বিকাল গড়াতেই চলে গেলাম লাকমাছড়া ঘুরতে। চারপাশে মেঘালয় পর্বতের সারি। ধাপে ধাপে নেমে আসা পাহাড়। একই সঙ্গে পাহাড়ের কোলজুড়ে নেমে আসা সাদা ঝরনার স্বচ্ছ পানি। পড়ন্ত বিকালে গোধূলিলগ্নে সূর্যের আলোয় রঙিন হয়ে ওঠে আকাশ, কমলা-সোনালি-লাল রঙের ছটায় এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়।

সেখান থেকে ঘুরে এসেই চলে গেলাম শহীদ সিরাজ লেকে সন্ধ্যা কাটাতে, যা বিখ্যাত নীলাদ্রি লেক নামেই বেশি পরিচিত। দিনের আলো নিভে এলে আমরা ফিরলাম বোটে। চুপচাপ রাতের হাওড়ে আকাশের পূর্ণিমার আলোয় চারপাশে যেন জাদুকরী পরিবেশ সৃষ্টি করল। প্রিয় মানুষদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা-হাসিতে দারুণ সময় কাটল।

ভোর হতেই নৌকা পথচলা শুরু করল যাদুকাটার পথে। একদম স্বচ্ছ ও নীলাভ যাদুকাটা নদী আপনাকে মুগ্ধ করবেই। ভারতের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে এই স্থান দিয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে নদীটি। বেরিয়ে পড়লাম যাদুকাটা নদীর নিকটবর্তী মানিগাঁও গ্রামে অবস্থিত শিমুল বাগান দেখতে।

সেখান থেকে ফিরে বাইকে করে বেরিয়ে পড়লাম বারেকটিলার রূপ গিলতে। বারেকটিলা ভারত-বাংলাদেশের সীমানাঘেঁষা সেই স্থান, যেখানে পাবেন মেঘালয়ের পাহাড়, ঝরনা আর যাদুকাটা নদীর বার্ডস আই ভিউ।

মনমাতানো সৌন্দর্যে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওড় আর সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি মেঘ। বৃষ্টির প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ বিরাজ করছে বারেকটিলায়, যা আপনাকে দিতে পারে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আত্মতৃপ্তি এবং আপনার ক্লান্ত মনটাকে একটু হলেও দোলা দেবে।

তপ্ত দুপুরে যাদুকাটা নদীর জলে জলকেলি করে প্রশান্ত মন নিয়ে নীলাকাশ দেখতে দেখতে আমরা ফেরার পথ ধরলাম। হাওড়ের চারপাশ জুড়ে থাকা মানুষের জীবনযাত্রা আর প্রকৃতি আনমনা করে দেয় নিজেকে।

আনমনে মন গেয়ে ওঠে—

‘আমি চলে যাব, তবু জীবন অগাধ

তোমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর ’পরে,

আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ করে!’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...