৬ জুলাই। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের এই দিনে ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর মগবাজারের ইনসাফ বারাকাহ কিডনি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অধ্যাপক মাহমুদা বেগম। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, দৈনিক আমার দেশ পাবলিকেশন্সের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের গর্বিত মা। কিন্তু আমার কাছে তিনি শুধু একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি নন—ছিলেন স্নেহময়ী ‘খালাম্মা’। যাঁর স্নেহ, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেম আজও গভীরভাবে মনে দাগ কেটে আছে।
আমি দীর্ঘদিন আমার দেশ-এ কর্মরত ছিলাম। সেই সূত্রে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সান্নিধ্যে যেমন কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে, তেমনি খালাম্মার স্নেহও পেয়েছি। পরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে দীর্ঘদিন বেকার জীবন কাটাতে হয়। একসময় আমিও সপরিবারে তুরস্কে চলে যাই। সে সময় সম্পাদক মাহমুদুর রহমানও দীর্ঘদিন তুরস্কে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন। সেই কঠিন সময়ে খালাম্মার সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে, ততবারই উপলব্ধি করেছি—তিনি ছিলেন অসাধারণ ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমে উজ্জ্বল একজন মানুষ।
আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, ২০২২ সালের ১৯ জুলাইয়ের কথা। ঢাকা সফরে এসে ভেবেছিলাম, অল্প সময়ের জন্য খালাম্মার সঙ্গে দেখা করে এক কাপ চা খেয়ে চলে যাব। কিন্তু তিনি আমাকে সারা দিনের অতিথি বানিয়ে ফেললেন। দুপুরের খাবার একসঙ্গে খেলাম। গল্প করতে করতে কখন যে বিকাল নেমে এলো, বুঝতেই পারিনি। বিদায়ের সময় তাঁর স্নেহমাখা দৃষ্টি আর শান্ত কণ্ঠস্বর যেন হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে রইল।
খালাম্মা খুব ধীরস্থিরভাবে কথা বলতেন। অযথা উচ্চকণ্ঠ, বাড়াবাড়ি বা অনর্থক হাসি-ঠাট্টা তাঁর স্বভাবে ছিল না। তিনি কম কথা বলতেন, কিন্তু প্রতিটি কথার মধ্যে থাকত গভীরতা, চিন্তা এবং দায়বদ্ধতার ছাপ। তাঁর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশ দেশের ভবিষ্যৎ, মানুষের অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং গণতন্ত্র।
একজন মা হিসেবে সন্তানের জন্য তাঁর উদ্বেগ ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় ছিল, ব্যক্তিগত কষ্টের চেয়ে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি কথা বলতেন। শেখ হাসিনা সরকারের সময় যখন তাঁর একমাত্র সন্তান সম্পাদক মাহমুদুর রহমান নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন, তখনো তাঁর কণ্ঠে আমি ব্যক্তিগত অভিযোগের চেয়ে বেশি শুনেছি দেশের মানুষের জাগরণের আকাঙ্ক্ষা। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তির চেয়ে দেশ বড়, আর দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
একজন শিক্ষকের পরিচয় শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না। অধ্যাপক মাহমুদা বেগম তাঁর জীবন, আদর্শ ও মূল্যবোধের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি ছিলেন তিতুমীর কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাংলা বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি যেমন শ্রদ্ধেয় ছিলেন, তেমনি পরিচিতজনদের কাছে ছিলেন একজন স্নেহশীল, মার্জিত ও নীতিবান মানুষ।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর স্মৃতি আজও অমলিন। ২০২২ সালের সেই ছবিটির দিকে তাকালে মনে হয়, যেন তিনি এখনো সেই পরিচিত ভঙ্গিতে বসে আছেন—শান্ত, স্থির, মমতাময়ী; দেশ নিয়ে ভাবছেন, মানুষের কথা ভাবছেন।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি প্রিয় খালাম্মা অধ্যাপক মাহমুদা বেগমকে। আল্লাহতায়ালা তাঁর জীবনের সব নেক আমল কবুল করুন, তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, কবরকে জান্নাতের বাগিচায় পরিণত করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।
লেখক: বিজনেস এডিটর, আমার দেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


