মেডিকেল খাতে অস্থিরতা কেন

ড. শাফিউল ইসলাম

মেডিকেল খাতে অস্থিরতা কেন
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত চিকিৎসকের সংকট, হাসপাতালের শয্যা, ওষুধের দাম কিংবা রোগীদের ভোগান্তির বিষয়গুলো সামনে আসে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—যারা আগামী দিনের চিকিৎসক হবেন, তারা কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবেশ এবং প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠছেন? কারণ একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুণগত মান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার চিকিৎসা শিক্ষার মানের ওপর। দুর্বল মেডিকেল শিক্ষা থেকে দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব নয়; আর দক্ষ চিকিৎসক ছাড়া উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্নও বাস্তবায়িত হতে পারে না।

এই প্রশ্ন এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একদিকে বাংলাদেশ হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান এবং অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসক, ট্রেইনি চিকিৎসক এবং এফসিপিএস প্রশিক্ষণার্থীদের ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালা, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা এবং পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে চিকিৎসক সমাজের একটি বড় অংশ অসন্তুষ্ট। প্রশ্ন হলো—এমন সময়ে স্বাস্থ্য খাতকে অস্থির করে লাভ কার?

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবার একটি বড় অংশ বাস্তবে ইন্টার্ন ও প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল। জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, রোগী পর্যবেক্ষণ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তারাই পরিচালনা করেন। অনেক ক্ষেত্রে রাতভর হাসপাতাল সচল রাখার দায়িত্বও তাদের কাঁধে থাকে। ফলে তাদের কর্মবিরতি বা অসন্তোষ শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়।

কিন্তু বর্তমান সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ঘাটতির বহিঃপ্রকাশ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সম্প্রসারণের সঙ্গে কি সমানতালে বেড়েছে শিক্ষার গুণগত মান?

বাস্তবতা বলছে, সংখ্যার তুলনায় মানোন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষকসংকট, গবেষণার সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং কার্যকর অ্যাক্রিডিটেশন ব্যবস্থার ঘাটতি আজ বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের বহু সরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস ও একাডেমিক ভবন কয়েক দশক আগে নির্মিত। কোথাও ভবনের দেয়াল ঝুঁকিপূর্ণ, কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ে, কোথাও ড্রেনেজ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা অপ্রতুল। আবাসন সক্ষমতার তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। বলা যায়, দেশের ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা’ আজ ‘অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে’ পরিচালিত হচ্ছে। একদিকে আমরা চিকিৎসকদের রোগীর জীবন রক্ষার দায়িত্ব দিচ্ছি, অন্যদিকে তাদেরই অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য করছি। এটি শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি শিক্ষার মান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পেশাগত উৎকর্ষের প্রশ্ন।

অবকাঠামোর পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি। বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা শিক্ষা দ্রুত সিমুলেশনভিত্তিক, দক্ষতানির্ভর এবং প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর মেডিকেল স্কুলে Simulation Laboratory, Skills Centre, Virtual Anatomy Lab, Digital Pathology এবং Artificial Intelligence-ভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক মেডিকেল কলেজে এখনো প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি, গবেষণা সুবিধা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শিক্ষকসংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। বহু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম। গবেষণায় উৎসাহ ও প্রণোদনার অভাবে মেধাবী চিকিৎসকদের একাডেমিক পেশায় আকৃষ্ট করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ফল হলো—শিক্ষাদান, গবেষণা এবং ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই মানগত সীমাবদ্ধতা।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলোÑমেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান কে নিশ্চিত করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে অ্যাক্রিডিটেশনের মধ্যে। অ্যাক্রিডিটেশন হলো একটি স্বাধীন ও পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুণগত মান আন্তর্জাতিক বা জাতীয় মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি নাÑতা যাচাই করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে Liaison Committee on Medical Education (LCME) নিয়মিতভাবে মেডিকেল স্কুলগুলোর শিক্ষার মান, শিক্ষকতা, গবেষণা, অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থী সহায়তা ব্যবস্থা মূল্যায়ন করে। যুক্তরাজ্যে General Medical Council (GMC) মেডিকেল শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশেও কঠোর অ্যাক্রিডিটেশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

বিশ্ব মেডিকেল শিক্ষা ফেডারেশন (WFME) বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো প্রদান করছে। ২০২৪ সাল থেকে বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিংয়ের ক্ষেত্রে WFME-স্বীকৃত অ্যাক্রিডিটেশনের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। ফলে অ্যাক্রিডিটেশন এখন শুধু শিক্ষার মানের প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থান এবং পেশাগত স্বীকৃতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্যের পেছনে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। National University of Singapore-এর Yong Loo Lin School of Medicine বর্তমানে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ মেডিকেল স্কুল। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া গত কয়েক দশকে চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। শুধু নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন করলেই হবে না; প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিএমডিসি, বিসিপিএস এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরো শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানকে দেশের বৃহত্তর ও পেশাগত উন্নয়নের স্বার্থে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অংশীজনদের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত দীর্ঘ মেয়াদে অধিক কার্যকর এবং গ্রহণযোগ্য হয়।

আজ প্রশ্নটি শুধু এফসিপিএস প্রশিক্ষণার্থীদের নয়, শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসকদেরও নয়। প্রশ্নটি হলো—বাংলাদেশ কি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যা আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক, গবেষক এবং স্বাস্থ্যনেতৃত্ব তৈরি করবে; নাকি এমন একটি ব্যবস্থা বজায় রাখতে চায়, যেখানে সংকট সৃষ্টি হওয়ার পরই শুধু সমস্যার গুরুত্ব উপলব্ধি করা হবে?

বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। উন্নত হাসপাতাল নির্মাণ করলেই উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে না। প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, শক্তিশালী গবেষণা, নিরাপদ প্রশিক্ষণ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসা শিক্ষা। আর তা নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামো, শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা, চিকিৎসক নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং অ্যাক্রিডিটেশন—সবগুলো বিষয়কে একই সংস্কার কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। শর্টকার্ট চিন্তা বা নীতি দিয়ে তা সম্ভব হবে না। একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

কারণ স্বাস্থ্য খাত দুর্বল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সমগ্র জাতি। আর একটি জাতির স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল হলে কর্মক্ষম ও সক্ষম জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে না, যা দেশের জন্য কখনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। তাই এখন সময় সংঘাত নয়, সংলাপের; প্রতিক্রিয়া নয়, সংস্কারের এবং সংখ্যার সম্প্রসারণ নয়, গুণগত উৎকর্ষের। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কত দ্রুত এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারি, এর ওপর। বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুতই এ বিষয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স এক্সপার্ট ও প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...