আটলান্টায় মিসরের বিপক্ষে ৬৬তম মিনিটেও দুই গোলে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষ হতে তখন বাকি কেবল ২৪ মিনিট। স্কোরলাইন ২-০, ডাগআউটে তখনও নিশ্চিন্ত লিওনেল স্কালোনি! তার দিকে ক্যামেরার লেন্স ঘুরতেই দেখা গেল এক চুমুক পানি খেতে। শরীরে ক্লান্তি, মাথায় অস্থিরতা আর গ্যালারিতে নিস্তব্ধতা। পরক্ষণেই বদলির সংকেত! রদ্রিগো ডি পল উঠলেন, নামলেন লাউতারো মার্টিনেজ। একজন মিডফিল্ডার কমিয়ে একজন স্ট্রাইকার। একই সময়ে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর জায়গায় নামলেন নিকোলাস গনজালেস। ডিফেন্ডারের জায়গায় আক্রমণপ্রবণ উইঙ্গার।
বার্তাটি ছিল স্পষ্ট; হারলেও সামনে গিয়ে হারব। এ দর্শনই স্কালোনির সবচেয়ে বড় পরিচয়।
বিশ্বকাপজুড়েই আর্জেন্টিনা ৪-৩-৩, ৪-৪-২ কিংবা ৪-২-৩-১ ফরমেশন বদলেছে। কিন্তু স্কালোনির দর্শন বদলায়নি। প্রতিপক্ষ যাই করুক, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়াই তার লক্ষ্য। মিসরের বিপক্ষেও তাই হলো।
দুই বদলির পরই আর্জেন্টিনা মাঠের প্রস্থ বাড়িয়ে দিল। মেসি আরো স্বাধীনভাবে মাঝখানে চলে এলেন। গনজালেস বাম প্রান্তে দৌড়াতে শুরু করলেন। লাউতারো একা স্ট্রাইকার হয়ে না থেকে কখনো ডানদিকে, কখনো মাঝখানে, কখনো আবার মেসির কাছাকাছি নেমে এসে মিসরের দুই সেন্টারব্যাককে টেনে বের করে আনতে থাকলেন।
এরপর ৭৩ মিনিটে আসে তৃতীয় চাল। গনসালো মন্তিয়েল মাঠে নামেন। অনেকেই তখন ভাবছিলেন, এটি কেবল ক্লান্ত একজন খেলোয়াড়ের পরিবর্তে আরেকজনের আগমন। কিন্তু স্কালোনির চোখে সেটি ছিল আরেকটি আক্রমণাত্মক অস্ত্র। ছয় মিনিট পর রোমেরোর গোল। তারও পাঁচ মিনিট পর মন্তিয়েলের পাস থেকেই আসে মেসির সমতাসূচক গোল। আর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্টিনেজ ডান দিক দিয়ে উঠে নিখুঁত ক্রস তুললেন। সেই বল হেডে জালে পাঠালেন এনজো ফার্নান্দেজ।
তিনটি গোল। তিনটি গোলেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে রইলেন স্কালোনির বদলি খেলোয়াড়রা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বহুবার স্কালোনিকে ‘ইন-গেম ম্যানেজমেন্টের মাস্টার’ বলা হয়েছে। দ্য অ্যাথলেটিক, ইএসপিএন, বিবিসি ও টিএওয়াইসি স্পোর্টস গত কয়েক বছরে তার একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বারবার লিখেছে। সেটি হলো, ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা। তিনি ম্যাচ দেখেন না, ম্যাচের ভবিষ্যৎ পড়েন।
কাতার বিশ্বকাপেও সে দৃশ্য বারবার দেখা গেছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে যখন গোল আসছিল না, স্কালোনি মাঠে নামালেন এনজো ফার্নান্দেজকে। সেই এনজোই করলেন দুর্দান্ত গোল। পোল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে আরো উঁচু পজিশনে নিয়ে গিয়ে আক্রমণের গতি বাড়ালেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জুলিয়ান আলভারেজকে সামনে রেখে প্রেসিং বাড়ালেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাঝমাঠে অতিরিক্ত খেলোয়াড় এনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিলেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে আবার অ্যাঞ্জেল দি মারিয়াকে বাম দিকে রেখে ফরাসি রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করলেন প্রথমার্ধেই।
কোপা আমেরিকায়ও একই গল্প। কখনো লাউতারো, কখনো জুলিয়ান, কখনো পারেদেস, কখনো গনজালেস; কে কখন ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারে, সেটি স্কালোনি অন্যদের আগেই বুঝে ফেলেন। এটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ফরমেশনে বন্দি নন। তার কাছে ৪-৩-৩ কিংবা ৪-৪-২ কেবল সংখ্যার বিন্যাস। আসল বিষয় হলো- কোন মুহূর্তে কোথায় অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড় লাগবে।
সাবেক কোচ মার্সেলো বিয়েলসার কাছ থেকে তিনি শিখেছেন খেলার গঠন। সিজার লুইস মেনোত্তির কাছ থেকে শিখেছেন সাহস আর নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি করেছেন এমন এক দর্শন, যেখানে হিসাব-নিকাশের মাঝেও আক্রমণই শেষ কথা। স্কালোনির আর্জেন্টিনা তাই দুই গোলে পিছিয়েও হাল ছাড়ে না। কারণ তারা জানে, বেঞ্চে এখনো কয়েকটি দাবার ঘুঁটি বসে আছে। আর বোর্ডের ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যিনি ঠিক জানেন-কোন চালটি ইতিহাস লিখবে।
আকাশি-সাদার ইতিহাসে তো ‘মাস্টার’ একজনই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


