(১ম পর্ব) : চলছে পবিত্র মহররম মাস। এ মাস এলেই ইতিহাসের পাতা থেকে ভেসে ওঠে কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় নাতি হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদত। শুধু একটি যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবেই নয়, কারবালার ঘটনা সত্য, ন্যায়, নীতি ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে যুগে যুগে মুসলিম বিশ্বের চেতনায় গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছে। তবে কারবালার এই ট্র্যাজেডি হঠাৎ করে ঘটেনি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, জটিল ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ এবং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসকে নিয়ে যায় কারবালার সেই রক্তাক্ত প্রান্তরে।
আসুন, ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর এই ট্র্যাজেডি কেন এবং কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, তার পটভূমি, ঘটনাপ্রবাহ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা জানার চেষ্টা করি।
খেলাফত হস্তান্তর
৪১ হিজরি। ঐক্যের বছর । হাসান (রা.) কর্তৃক মুয়াবিয়া (রা.) এর হাতে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে খুলাফায়ে রাশেদা যুগ শেষ হয়। মুসলিমজাহানের খলিফা হন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)। সন্ধি ও খেলাফত হস্তান্তরের পর হাসান (রা.) শান্ত ও নিবৃত্ত জীবনযাপন শুরু করেন। হাশেম গোত্রের শীর্ষ নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইবাদত-বন্দেগি ও জিকিরে নিয়োজিত থাকতেন এবং দীর্ঘ সময় মসজিদে নববিতে কাটাতেন। তার ভাই হোসাইন (রা.) সব সময় তার অনুগত ছিলেন। বড় ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কারণে কোনো বিষয়ে তিনি নিজে থেকে এগিয়ে যাওয়া বা আগে কথা বলা পছন্দ করতেন না।
হাসান (রা.) এর শাহাদাত
৪৯ হিজরিতে হাসান (রা.) কে বিষ প্রয়োগ করা হয়। নিজের শরীরে বিষের প্রবল প্রভাব তিনি অনুভব করতে থাকেন। তবে তিনি কোনো ধরনের রক্তপাত চাননি। তাই বিপ্লবী ভাই হোসাইনকে বিষপ্রয়োগকারীর নাম জানাননি। সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারার ইতিহাসবিদরাই বিষপ্রয়োগে তার শহীদ হওয়ার বিষয়ে একমত। মৃত্যুশয্যায় হাসান (রা.) অসিয়ত করেন, তাকে যেন প্রিয় নবী (সা.) এর পাশে দাফন করা হয়। তবে এতে কোনো ফেতনার আশঙ্কা থাকলে সাধারণ মুসলমানদের কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে দাফন করার শর্ত জুড়ে দেন। তার ইন্তেকালের পর উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) এবং মদিনার গভর্নর অনুমতি দিলেও, মারওয়ান ইবনে হাকাম ও বনু উমাইয়াদের একাংশ বাধা দেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এবং হাশেমি যুবকরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে রক্তপাত এড়াতে তাকে বাকিতেই দাফন করা হয়। হাসান (রা.) এর বিদায়ের পর হোসাইন (রা.) বনু হাশেমের নেতা হন। তিনি ভাইয়ের করা চুক্তি ও বাইয়াতের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি মুয়াবিয়ার শাসনামলে ৫১ হিজরিতে ঐতিহাসিক কনস্টান্টিনোপল অভিযানেও অংশ নেন।
কারবালার প্রেক্ষাপট
কারবালার মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির প্রেক্ষাপট তৈরি হয় মুয়াবিয়া (রা.) এর ছেলে ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার পরে। ইয়াজিদের খলিফা মনোনয়ন যৌক্তিক ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে অধিকাংশ আলিমের মতামত হলো, এই সিদ্ধান্তের কারণে মুয়াবিয়া (রা.) এর প্রতি কোনো অবমাননাকর মন্তব্য করা বৈধ নয়। কেননা ইয়াজিদের সে সময়ের বাহ্যিক যোগ্যতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তাকে খলিফা মনোনীত করেছিলেন।
ইয়াজিদের মনোনয়নে খলিফা মুয়াবিয়া (রা.) এর দৃষ্টিভঙ্গি
প্রথম জীবনে কনস্টান্টিনোপল অভিযানে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া এবং হজের আমিরের দায়িত্ব ভালোভাবে পালনের মাধ্যমে ইয়াজিদ নিজের সাংগঠনিক যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন। সে সময় বাহ্যিকভাবে তার মধ্যে বড় কোনো ত্রুটি প্রকাশ পায়নি। ফলে খলিফা মুয়াবিয়া তাকে খেলাফতের অযোগ্য মনে করেননি। কিন্তু হোসাইন (রা.) কিংবা আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর মতো প্রথম সারির প্রবীণ, খোদাভীরু ও অনন্য মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবিদের উপস্থিতিতে ইয়াজিদের মতো একজন তরুণকে খলিফা পদে আসীন করা উম্মাহর বড় একটা অংশের কাছে আপত্তিকর মনে হয়েছিল।
বিশেষ করে, মক্কা ও মদিনার শীর্ষস্থানীয় পাঁচজন সাহাবি ইয়াজিদের এই খেলাফত মনোনয়নের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। তারা হলেন—
১. হোসাইন ইবনে আলি (রা.),
২. আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.),
৩. আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.),
৪. আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.)
৫. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)
তাদের মূল আপত্তি ছিল, নিজের সন্তানকে উত্তরসূরি নির্বাচন করা খুলাফায়ে রাশেদিনের প্রতিষ্ঠিত আদর্শবিরোধী। তাদের আশঙ্কা ছিল, এর ফলে খেলাফত শাসনব্যবস্থায় রাজতান্ত্রিক বা বংশতান্ত্রিক ধারার সূচনা হবে। মূলত সে সময় ইয়াজিদ ফাসেক কিংবা মদ্যপায়ী— এমন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং ‘যোগ্যতম ব্যক্তিরা উপস্থিতিতে কেন কমযোগ্য কাউকে খেলাফতের আসনে বসানো হচ্ছে’—এটিই ছিল সাহাবিদের আপত্তির মূল কারণ।
মুয়াবিয়া (রা.) মনে করেছিলেন, যদি মূল উদ্দেশ্য শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে বংশীয় শাসনের সুযোগ ইসলামে রয়েছে। কারণ কোরআন ও হাদিসে এর কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই। তিনি উদাহরণ হিসেবে দাউদ (আ.) এর পর তার পুত্র সুলাইমান (আ.) এর রাজত্বের উত্তরাধিকারী হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছিলেন।
বিশ্ববরেণ্য ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন ‘মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে এই সিদ্ধান্তের একটি রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুয়াবিয়া (রা.) যোগ্যতর ও উত্তম সাহাবিদের পরিবর্তে ইয়াজিদকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন মূলত উম্মতের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব রক্ষার স্বার্থে। তৎকালীন সময়ে আরবের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গোত্র ছিল বনু উমাইয়া। বনু উমাইয়ার নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা সে সময় নিজেদের গোত্রের বাইরে অন্য কারো নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। তাই মুসলিম উম্মাহর মাঝে যেন নতুন করে গৃহযুদ্ধ বা বিভেদ সৃষ্টি না হয় এবং সামষ্টিক ঐক্য অটুট থাকে, সেই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই মুয়াবিয়া (রা.) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; ইয়াজিদকে শ্রেষ্ঠ মনে করে নয়। (তারিখে ইবনে খালদুন, মুকাদ্দিমা, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৬৩।)
ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা ঘোষণা করার পর মুয়াবিয়া (রা.) একদিন জুমার খুতবায় আল্লাহতায়ালার কাছে দোয়া করেছিলেনÑ
‘হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আমি ইয়াজিদকে এ পদের যোগ্য মনে করেই খেলাফতের দায়িত্ব দিয়েছি। আপনি যদি জানেন যে, এ সিদ্ধান্তে আমি সঠিক ছিলাম, তবে তাকে এতে সফলতা ও পরিপূর্ণতা দান করুন। আর যদি আপনি জানেন যে, আমি তাকে কেবল পিতৃস্নেহের বশবর্তী হয়ে এ দায়িত্ব দিয়েছি, তবে আপনি এতে কোনো পরিপূর্ণতা দান করবেন না।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ৩০৮।)
এই দোয়াটি মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিয়তের স্বচ্ছতা এবং ইখলাস ও আন্তরিকতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, তিনি অন্ধ পুত্রস্নেহের কারণে খেলাফত বা মুসলিম উম্মাহর কোনো ক্ষতি কামনা করেননি। বরং তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত অনুরাগের চেয়ে উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণ, ঐক্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষার আন্তরিক প্রচেষ্টাই মুখ্য ছিল।
ইয়াজিদের বাইয়াত ও হোসাইন (রা.)
হোসাইন ইবনে আলি ও আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) এর অবস্থান মুআবিয়ার শাসনকাল থেকেই অত্যন্ত সুস্পষ্ট ছিল। তাদের সুচিন্তিত অভিমত ছিল, বংশানুক্রমে রাজতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতি পরিহার করে খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলের সেই বিস্তৃত ও সর্বজনীন পরামর্শভিত্তিক শুরা ব্যবস্থাকে তার আদি এবং অকৃত্রিম রূপে ফিরিয়ে আনা উচিত এবং মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব সমাজের সবচেয়ে যোগ্য ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা উচিত । এই মৌলিক আদর্শগত ভিন্নতার কারণে তারা ইয়াজিদকে অলি আহাদ বা পরবর্তী খলিফা মনোনয়নের বাইয়াত থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিলেন।
ইয়াজিদের প্রতি বাইয়াত করা হয়তো তাদের জন্য সাময়িক ছাড় বা ‘রুখসত’-এর পর্যায়ভুক্ত হতে পারত। কিন্তু ঈমানি দৃঢ়তা ও আপসহীনতার দাবি ছিল এমন এক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধ্যমতো অবস্থান গ্রহণ করা, যার ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে অসংখ্য ফিতনা ও অনিষ্টের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ কারণেই তাদের প্রতিবাদের প্রথম প্রকাশ ছিল, তারা নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেননি; ইসলামী রাজনীতির সঠিক রূপরেখা উম্মাহর সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন এবং কোনো অবস্থাতেই বাইয়াতের মাধ্যমে ইয়াজিদের শাসনের বৈধতা স্বীকার করেননি।
বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার বিশ্লেষণ
সে সময়ের পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিক রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, হোসাইন (রা.) এবং আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) অবস্থান প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর তা হলো, তারা ইয়াজিদের বাইয়াত বা আনুগত্য স্বীকার করবেন না এবং নিজেদের নীতি ও আদর্শিক অবস্থানের পরিপন্থী কোনো আপসে জড়াবেন না। বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক সূত্রে এমন কোনো তথ্য বা বিবরণ পাওয়া যায় না, যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সে সময়ে তারা রাষ্ট্রীয় বিদ্রোহ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর লক্ষ্যে কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। যদি তাদের তেমন কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা উদ্দেশ্য থাকত, তবে মুআবিয়া (রা.) এর শাসনামল থেকেই কুফাবাসীর পক্ষ থেকে তাদের কাছে যে অজস্র চিঠিপত্র এসেছিল। তারা সেগুলোর ইতিবাচক জবাব দিতে পারতেন।
উল্লেখ্য, সেসব চিঠিতে হোসাইন (রা.) কে কুফায় এসে উম্মাহর নেতৃত্বভার গ্রহণ করার বিনীত আহ্বান জানানো হচ্ছিল। (আলমুজামুল কাবির, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৭০।) কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এর প্রমাণ মেলে না যে, তিনি তখন সেই আহ্বানে বিন্দুমাত্র আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন কিংবা কোনো ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিলেন।
ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, ইয়াজিদের সিংহাসন আরোহণের পরও হোসাইন (রা.) কুফায় যাওয়ার কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেননি। সম্ভবত তিনি আমৃত্যু মদিনার শান্তিময় পরিবেশেই অবস্থান করা পছন্দ করতেন এবং ব্যক্তিগত আদর্শ হিসেবে নিজের ভিন্নমতের ওপর অবিচল থাকাকেই যথেষ্ট মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি যখন চরম রূপ ধারণ করে এবং বাধ্যতামূলক বাইয়াতের অবমাননাকর চাপ ও নানামুখী সংকটের মুখে তাকে জন্মভূমি ত্যাগ করতে হয়, শুধু তখনই তিনি অনন্যোপায় হয়ে কুফাবাসীর ধারাবাহিক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে বাধ্য হন। (আনসাবুল আশরাফ, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৫৫, ১৫৬।)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

