বিশ্লেষণ

ভিএআরের রায় সঠিক সিদ্ধান্তের, আবেগের নয়

আজাদ মজুমদার

ভিএআরের রায় সঠিক সিদ্ধান্তের, আবেগের নয়

আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ শেষ । আর্জেন্টিনা শেষ আটে। মিসর বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপ থেকে। কিন্তু শেষ হয়নি এ ম্যাচ ঘিরে বিতর্কের। বিশেষ করে মিসরের বাতিল হওয়া গোল এবং আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহর ওপর সম্ভাব্য ফাউল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনা। অনেকেই বলছেন, রেফারি ও ভিএআর আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিয়েছে।
কিন্তু ফুটবলে আবেগের চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আইন। আর সে আইন কী বলছে-সেটাই দেখা জরুরি।
মিসরের বাতিল হওয়া গোলের ঘটনাটি দিয়ে শুরু করা যাক।
আইএফএবির ভিএআর প্রোটোকলের ২নং নিয়মে বলা হয়েছে-রেফারিকে অবশ্যই একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অর্থাৎ রেফারি ‘কোনো সিদ্ধান্ত নেই’ বলে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভিএআর ব্যবহার করতে পারবেন না। কোনো কথিত ফাউলের পর খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা যেতে পারে।’
লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ওপর ফাউলের ক্ষেত্রে রেফারির প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি আসলে মিসরের পক্ষেই গিয়েছিল। কারণ, তিনি ফাউল না দিয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। খেলা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়াটাও রেফারির একটি সিদ্ধান্ত। তাই ২নং নিয়ম অনুযায়ী ঘটনাটি ভিএআর পর্যালোচনার সম্পূর্ণ যোগ্য ছিল।
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ফাউলের পর তো প্রায় ৩০ সেকেন্ড খেলা চলেছিল। এরপর কীভাবে ভিএআর আগের ঘটনায় ফিরে গেল?
এখানেও প্রোটোকল পরিষ্কার।
ভিএআর প্রোটোকলের ৬নং নিয়মে বলা হয়েছে, ‘পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার জন্য কোনো সময়সীমা নেই। কারণ, গতির চেয়ে নির্ভুলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
অর্থাৎ, ফাউলের পর কিছুক্ষণ খেলা চললেও যদি সেটি একই আক্রমণাত্মক ধারাবাহিকতার অংশ হয় এবং পরে গোল হয়, তাহলেও ভিএআর সে ঘটনায় ফিরে যেতে পারে। ফলে মোস্তফা জিকোর গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) প্রোটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
এবার আসা যাক আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সালাহর ওপর সম্ভাব্য ফাউল প্রসঙ্গে। মিসরের দাবি ছিল সেখানে ফাউল হয়েছে। কিন্তু ভিএআর কেন হস্তক্ষেপ করল না? এর উত্তরও আইএফএবির প্রোটোকলেই রয়েছে।
ভিএআর প্রোটোকলের ৩নং নিয়মে বলা হয়েছে, ‘রেফারির দেওয়া মূল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না, যদি না ভিডিও রিভিউতে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, সিদ্ধান্তটি একটি সুস্পষ্ট ও অনিবার্য ভুল ছিল।’
এ ক্ষেত্রে ভিএআর হস্তক্ষেপ করেনি; কারণ রেফারির সিদ্ধান্তটি একটি ‘সুস্পষ্ট ও অনিবার্য ভুল’ বলে মনে হয়নি। ফলে এখানেও ৩নং নিয়মেরই প্রয়োগ হয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া দরকার।
ম্যাচের সময় মিসরের পক্ষ থেকে বারবার ভিএআর রিভিউর দাবি তোলা হয়েছিল। কিন্তু ভিএআর ব্যবস্থায় এমন কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন করার সুযোগই নেই। ভিএআর প্রোটোকলের ১২নং নিয়মে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু ভিএআর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিটি পরিস্থিতি/সিদ্ধান্ত যাচাই করবে, তাই কোচ বা খেলোয়াড়দের পর্যালোচনার জন্য অনুরোধ করার কোনো প্রয়োজন নেই।’
অর্থাৎ, কোনো দল চাইলেই ভিএআর রিভিউ হবে-এমন কোনো নিয়ম নেই। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই ভিএআর নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা করে। প্রায় প্রতিটি ফ্রেম তার রিভিউ করে। সব মিলিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্ত এবং ভিএআরের হস্তক্ষেপ আইএফএবি ভিএআর প্রোটোকলের সঙ্গেই ছিল। এটিকে ‘এক যাত্রায় পৃথক ফল’ বলার সুযোগ আইন দেয় না।
ফুটবল অবশ্য শুধু নিয়মের খেলাই নয়, আবেগেরও। আর আবেগ থেকেই অনেক সময় পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এ ম্যাচের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগের চেয়ে নিয়মের সঠিক প্রয়োগের ব্যাখ্যাই বেশি শক্তিশালী।
এ প্রসঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ঘটনাও মনে পড়ে।
মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর এদিন অসাধারণ কিছু সেভ করেছেন। তার বাবা আহমেদ শোবেইরও ছিলেন মিসর জাতীয় দলের গোলরক্ষক। ১৯৯০ ফিফা বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ০-০ ড্র ম্যাচে আহমেদ শোবেইর ডিফেন্ডারদের বারবার ইচ্ছাকৃত ব্যাক-পাস হাত দিয়ে ধরে সময় নষ্ট করেছিলেন। সে সময়ের নিয়মে এটি বৈধ ছিল; কিন্তু সে নিয়মের অপব্যবহারই পরে ফিফাকে ব্যাক-পাস আইন পরিবর্তনে বাধ্য করে। ১৯৯২ সাল থেকে সতীর্থের ইচ্ছাকৃত ব্যাক-পাস গোলরক্ষকের হাতে ধরা নিষিদ্ধ হয়।
ইতিহাসের এ ঘটনাটি একটি সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয়—ফুটবলে দল নয়, নিয়মই শেষ কথা। যে নিয়ম এক সময় মিসরের পক্ষেও ছিল, আজ সে একই নিয়ম অন্য একটি ম্যাচে আর্জেন্টিনার পক্ষেও যেতে পারে।
সুতরাং আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ বিতর্কের শেষ কথাটা সম্ভবত এটুকুই—রেফারির সিদ্ধান্ত পছন্দ হতেই হবে এমন নয়; কিন্তু সেটি আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন। এই ম্যাচে সে প্রশ্নের উত্তর আইনই দিয়ে দিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...