জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। সরকারের পক্ষ থেকে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ইঙ্গিত পাওয়ার পর থেকেই নগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ গোছাতে শুরু করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থনের নতুন পরীক্ষা হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে পরিবর্তন আসে, তার ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীও তৃণমূলভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করে নতুন করে আলোচনায় আসে। অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এনসিপি তরুণ ভোটারদের মধ্যে ভিত্তি তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো এখনো বিএনপি ও জামায়াতের মতো বিস্তৃত নয়, তবুও সম্ভাব্য প্রার্থী খোঁজা, সাংগঠনিক বিস্তার ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দলটি।
সম্ভাব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক সভা, কর্মিসমাবেশ, মতবিনিময় সভা এবং গণসংযোগ কার্যক্রম বাড়িয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। নগরীর চায়ের দোকান থেকে গ্রামের হাট-বাজার—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু স্থানীয় সরকার নির্বাচন। কে হবেন মেয়র, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান কিংবা কাউন্সিলর—তা নিয়েই চলছে নানা আলোচনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে কিছু এলাকায় এনসিপির অংশগ্রহণ ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
রাজশাহীতে বিএনপির জনভিত্তি ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী হলেও গত কয়েক বছরে জামায়াতও তৃণমূলে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করেছে। ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী ও বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দলটি নিজেদের পরিধি বাড়িয়েছে। ফলে অনেক এলাকাতেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
বিএনপি নেতাদের দাবি, জাতীয় নির্বাচনে জনগণ যে আস্থা দেখিয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনেও তার প্রতিফলন ঘটবে। তাদের মতে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে জনগণ আবারও বিএনপির ওপর আস্থা রাখবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বলছে, তরুণদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। রাজনৈতিক আদর্শ, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার কারণে জনগণের সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি দলটির। দলটির স্থানীয় নেতা রফিকুল ইসলাম বকুল বলেন, আগামীতে আধুনিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টিও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, প্রশাসক নিয়োগ বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা ও নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া উচিত এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা প্রয়োজন।
তবে বিএনপি এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে বাস্তব জনসমর্থন পাওয়া যায় না। মানুষের কাছে যেতে হবে, তাদের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নির্বাচনে বড় বিজয়ের পর বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনসমর্থন ধরে রাখা। সরকার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে দলটির প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে স্থানীয় নির্বাচনে কিছুটা চাপের মুখে পড়তে পারে বিএনপি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রমাণের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে।
রাজশাহী মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, দলের শ্রমিক, ছাত্র, ছাত্রী ও মহিলা সংগঠন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। যে প্রার্থীই মনোনয়ন পান না কেন, সবাই তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় জনপ্রিয়তার পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বড় ভূমিকা রাখলেও স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাররা প্রার্থীর আচরণ, জনসম্পৃক্ততা এবং এলাকার তার কাজের বিষয়গুলো বেশি বিবেচনা করেন। ফলে জাতীয় নির্বাচনের ফল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সবসময় একইভাবে প্রতিফলিত হয় না।
রাজশাহীর সাহেববাজার এলাকার ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, জাতীয় নির্বাচনে দল বড় বিষয় হলেও স্থানীয় নির্বাচনে মানুষ আগে দেখে প্রার্থী কেমন এবং নির্বাচনের পর তিনি মানুষের পাশে থাকবেন কি না।
পবা উপজেলার কৃষক নাদের আলীর ভাষ্য, আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি নির্বাচনের পরও মাঠে থাকবেন এবং কৃষকসহ সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে কাজ করবেন।
নগরীর শালবাগান এলাকার রিকশাচালক আবুল কালাম বলেন, রাজনীতি বুঝি না। তবে যে নেতা এলাকার উন্নয়ন করবে, রাস্তা ঠিক করবে, ড্রেনেজ সমস্যা সমাধান করবে, মানুষ তাকেই ভোট দেবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফল মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে—প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। তার মতে, জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নিবেদিত কর্মীবাহিনী অনেক এলাকায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রার্থী নির্বাচন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত প্রায় সব স্তরেই একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকায় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তার প্রভাব নির্বাচনের ফলেও পড়তে পারে।
এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি, তবে সম্ভাব্য নির্বাচনকে ঘিরে রাজশাহীর রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়তে শুরু করেছে। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের সাফল্য স্থানীয় পর্যায়ে ধরে রাখতে চায়, আর জামায়াতে ইসলামী তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে ভোটে রূপ দিতে চায়। ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি রাজশাহীর রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনভিত্তি যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

